শিশুকে জানতে দিন যৌন নিগ্রহ সম্পর্কে


শিশুকে যৌন নিগ্রহ সম্পর্কে জানতে দিন

সাঁতার কাটা, লেখা-পড়া, রাস্তা পার হওয়া, সাইকেল চালানো সর্বোপরি আত্মবিশ্বাসের সাথে চলতে একটা মানুষের যা লাগে, আমরা ছোটবেলা থেকেই শিশুকে সেসব বিষয়ে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিই। যাতে ভয় পেয়ে থমকে না যায় জীবন। কিন্তু শিশুকে যৌন নিগ্রহ বা হয়রানি থেকে বাঁচাতে আমরা ক’জন বিষয়টি নিয়ে শিশুর সাথে আলাপ করি খোলামেলাভাবে? যৌন বিষয়ে কথা বলাটা এখনও ট্যাবু এদেশে, আর শিশুর সাথে বলাটাতো আরও বেশি নিরুৎসাহিত। কিন্তু ফলাফল? যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে শিশুরা। নিজেকে রক্ষা করাতো দূরের কথা, মুখ ফুটে কাউকে জানাতেও পারে না। হতাশা, ভয় আর তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়। কেউ নিজেই অপরাধী হিসেবে বেড়ে ওঠে, কেউ বা নিজেকেই শেষ করে দেয়, আর কেউ হয়ত বা জীবন সম্পর্কেই একটা ভুল ধারণা নিয়ে কাটিয়ে দেয়।

কাজেই শিশুর সাথে শিশুর মত করেই কথা বলুন যৌন হয়রানি বিষয়ে। যাতে নিজেকে সে রক্ষা করার সাহস খুঁজে পায়। শুধু মেয়েশিশুই নয়, আপনার ছেলে শিশুটিও কিন্তু অপরাধীর কাছে নিরাপদ নয়।

কাজেই সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, তাকে শেখানঃ

০১। তার শরীরের গোপন অংশসহ সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম। যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে গেলে অন্তত কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারে কী ঘটেছিল।
০২। তাকে কোন কিছু চেপে রাখতে বারণ করুন। তাকে বলুন কেউ তার সাথে অপ্রীতিকর কোন আচরণ করে, “সে বিষয়ে কাউকে বললে অনেক খারাপ হবে” এ কথা শুনে কোন কিছু যেন আপনার কাছে গোপন না করে।
০৩। বড়রা সবসময়ই সঠিক নন, একথা শিশুকে বুঝতে দিন। সন্তানকে বলুন বয়েসে বড় কারও কোন কথা বা আচরণ অস্বাভাবিক বলে মনে হলে সে যেন অন্তত আপনার কাছে এসে বলে।
০৪। শিশুকে বুঝতে দিন যে, তার সাথে অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে আপনি অবশ্যই সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন শিশুকে অবহেলা না করে। তাকে ভরসার জায়গাটা দিন।
০৫। স্পর্শের ভাল-মন্দ বুঝতে দিন শিশুকে। তাকে খারাপ স্পর্শ আর ভাল স্পর্শ চিনিয়ে দিন। কারও স্পর্শের ব্যাপারে শিশু আপত্তি বা দ্বিধা জানালে, সাথে সাথে ব্যবস্থা নিয়ে তাকে আশ্বস্ত করুন।
০৬। শুধুমাত্র অভিভাবক এবং ডাক্তার ছাড়া আর কেউ শিশুর ব্যক্তিগত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্পর্শ করবে না, একথা শিশুকে জানান। এর অন্যথা হলেই সেটি অন্যায়।
০৭। আত্মীয়, প্রতিবেশি বা অপরিচিত – যেই হোক না কেন আর যাই বলুক না কেন, আপনার শিশু কখনও যেন একা তার সাথে কোথাও না যায়।
০৮। শুধু স্পর্শই নয়, কারও কোন কথাও যদি অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে সেটিও যেন আপনার সন্তান আপনাকে সময়মত জানিয়ে দেয়।

পারিবারিক নিয়ম তৈরি করে দিনঃ

০১। শিশু বাড়িতে একা আছে, এটা বাইরের কাউকে জানানো যাবে না।
০২। বাচ্চাকে দেখভাল করার জন্য নতুন কাউকে নিযুক্ত করতে হলে শিশুর মতামত নিতে হবে।
০৩। পারিবারিক নিয়মসমূহ কেউ ভাঙতে চাইলে, শিশু অবশ্যই তা অভিভাবককে জানাবে এবং অভিভাবক সাথে সাথে ব্যবস্থা নেবেন।
০৪। শিশু শুধুমাত্র বিশ্বস্ত কারও সাথেই গাড়িতে চড়তে বা কোথাও যেতে পারবে, কিন্তু অন্য কারও বেলায় অনুমতি প্রযোজ্য।

শিশুকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করুনঃ

শিশুকে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা তাকে আগেভাগেই কী করতে হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে শেখান। যেমনঃ

০১। এমন একটি স্থানে শিশু খেলাধুলা করছে, যেখানে যাওয়া বারণ। এমন অবস্থায় কোন নারী বা পুরুষ যদি তাকে গাড়িতে উঠতে বলে, তবে সে কী করবে?
০২। শপিং মলে শিশু অভিভাবকের হাতছাড়া হয়ে গেলে কী করবে?
০৩। কেউ যদি অস্বাভাবিকভাবে শিশুকে স্পর্শ করে এবং বিষয়টি গোপন রাখতে বলে, তাহলে তার কী করা উচিত?
০৪। কেউ আদর করে কোন খেলনা বা খাবার অফার করলে, শিশু কী করবে? যদি পারিবারিক নিয়ম ভঙ্গ করে শিশু তার চাহিদার কোন কিছু কারও মাধ্যমে পাওয়ার অফার পায়, তখন কী করা উচিত?

শিশুর মধ্যে সোজা-সাপ্টা কথা বলার অভ্যাস তৈরি করুনঃ

০১। “আমি এ জাতীয় কথা বলতে বা শুনতে পছন্দ করি না”।
০২। “আমরা কি একটু দূরে সরে বসতে পারি?”
০৩। “আমাকে একা থাকতে দিন”।
০৪। “এটা করার অনুমতি নেই আমার”।
০৫। “না”।

কথা না বলেও আপত্তি জানানো যায়। যেমনঃ গা থেকে হাত সরিয়ে দেয়া, সরে যাওয়া, দৌড়ে পালানো, চোখে চোখে তাকানো ইত্যাদি। সময়ে সময়ে এসবের ব্যবহারও শিশুকে শিখিয়ে দেয়া জরুরি।

শিশুকে একটি কথা খুব ভাল করে বুঝিয়ে দিন যে, বয়েসে তার চেয়ে বড় যে কেউ, সে আত্মীয়, প্রতিবেশী বা অচেনা যেই হন না কেন, তার আচরণ সবসময়ই যে সঠিক হবে, তা নয়। আচরণের স্বাভাবিকতা-অস্বাভাবিকতার পার্থক্য শিশুকে বুঝিয়ে দিন। শুধু বাইরের লোকই নয়, যেকোন সময় কাছের মানুষ, যাকে শিশু বিশ্বাস করে, তার দ্বারাও শিশুর ক্ষতি হতে পারে। সুতরাং উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে শিশুকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করে তুলুন।

নুজহাত ফারহানা, লাইফ-স্টাইল ব্লগার
আওয়ার কিডস সেন্টার ডট কম অবলম্বনে

 

আর্টিকেলটি ভাল লাগলে লাইক করুন, শেয়ার করুন। কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান।

 

Have any Question or Comment?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *