দাঁত মাজার সঠিক পদ্ধতি

শরীর রক্ষায় দাঁত মাজুন!

দাঁত মাজা শুধু সুন্দর হাসি বা সজীব নিঃশ্বাসের জন্যই না, আপনার সমস্ত শরীরের জন্যেই জরুরি। আপনি যখন দাঁত মাজেন বা ব্রাশ করেন তখন আপনার দাঁতের ওপরের ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করেন। এই ব্যাকটেরিয়া দাঁতে ক্যাভেটিজ, মাড়ির সমস্যা তৈরি করে। যদি দীর্ঘ সময় তা অবহেলা করেন তাহলে আপনার দাঁত পড়ে যাবে। আপনি জানেন আপনি কেন দাঁত মাজেন, কিন্তু যদি জানতে চান  কীভাবে সঠিক পদ্ধতিতে দাঁত মাজবেন করবেন তাহলে নিচের এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।

এক. কী কী লাগে

১) ভালো টুথব্রাশ ব্যবহার করুন

টুথব্রাশ

নরম নাইলনের ব্রিস্টলওয়ালা ব্রাশ বেছে নিন। এটা কার্যকরভাবে আপনার দাঁতের ওপরের ব্যাকটেরিয়ার স্তর এবং খাবারের কণা পরিষ্কার করবে। শক্ত ব্রিস্টলওয়ালা ব্রাশ আপনার মাড়ির ক্ষতি করে এবং দাঁতের এনামেলের স্তর ক্ষয় করে।

টুথব্রাশ বাছাই করার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখবেন তা যেন হাত দিয়ে ধরতে আরামদায়ক হয়। ব্রাশের মাথা ছোট হলে সহজেই তা দাঁতের সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে, বিশেষ করে দাঁতের পিছনের অংশে। যদি ব্রাশ বেশি বড় হয় তাহলে আপনার মুখেও তা ভালোভাবে ফিট হবে না।

আপনি যদি ব্রাশ করতে আলসেমি বোধ করেন বা বেশি সময় নিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে চান তাহলে ইলেকট্রিক টুথব্রাশ আপনার জন্য ভালো অপশন। কিন্তু টেকনিক জানা থাকলে ম্যানুয়াল টুথব্রাশই ব্রাশ করার জন্য ভালো।

পশু-পাখির লোম দিয়ে তৈরি ব্রিস্টলওয়ালা ব্রাশ এড়িয়ে চলুন। কারণ এতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটতে পারে।

২)  তিন-চার মাস পর পর নতুন ব্রাশ কিনুন

ব্রাশ

নির্দিষ্ট সময় পর ব্রাশের ব্রিস্টল নষ্ট হয়ে যায়। ব্যবহারের ফলে ব্রিস্টলের ফ্লেক্সিবিলিটি এবং কার্যকারিতা চলে যায়। প্রতি তিন-চার মাস পর পর নতুন ব্রাশ ব্যবহার  করুন।

অথবা ব্রিস্টলের আকৃতি নষ্ট হতে শুরু করলেই ব্রাশ পরিবর্তন করুন। ব্রাশের আসল সময়সীমার থেকে ব্রাশের বাইরের অবস্থা দেখে বুঝে নিন ব্রাশের অবস্থা কেমন। যে ব্রাশের মেয়াদ পার হলে হ্যান্ডেলের রঙ বদলে যায় সে ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে ব্রাশের ব্রিস্টল এবং হ্যান্ডেলে হাজার রকম জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে এবং এগুলি ইনফেকশন ঘটায়।

গবেষণায় দেখা গেছে ব্রাশের ব্রিস্টল এবং হ্যান্ডেলে হাজার রকম জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে এবং এগুলি ইনফেকশন ঘটায়।

সবসময় ব্রাশ করা শেষে ব্রাশ ভালোভাবে ধুয়ে রাখুন এবং মাথা খোলা অবস্থায় রাখুন। তাতে ব্রাশ ভালোভাবে শুকায়, ফলে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে না।

৩) ফ্লুরাইড টুথপেস্ট ব্যবহার করুন

ফ্লুরাইড টুথপেস্ট

ফ্লুরাইড টুথপেস্ট দাঁত সম্পূর্ণ ভাবে জীবাণুমুক্ত করে, এটা আপনার দাঁতের এনামেল স্তরকে শক্তও করে।

লক্ষ্য রাখতে হবে পেস্ট যাতে কোনোভাবে পেটে না যায়। অতিরিক্ত পেস্ট পেটে গেলে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। ৩ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের ফ্লুরাইড টুথপেস্ট ব্যবহার করতে দেবেন না। বাচ্চাদের মটরদানার চেয়ে বেশি ফ্লুরাইড টুথপেস্ট ব্যবহার করতে দেবেন না। এবং বাচ্চারা ভুলক্রমে ফ্লুরাইড টুথপেস্ট খেয়ে ফেললে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

বাচ্চাদের মটরদানার চেয়ে বেশি ফ্লুরাইড টুথপেস্ট ব্যবহার করতে দেবেন না। এবং বাচ্চারা ভুলক্রমে ফ্লুরাইড টুথপেস্ট খেয়ে ফেললে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

আপনাকে এমন টুথপেস্ট বেছে নিতে হবে যেটা দাঁত এবং মাড়ির নানা ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। যেমন, ক্যাভিটিজ, ছত্রাক, দাঁত এবং মাড়ির সংবেদনশীলতা, জিনজিভিটিজ এবং দাঁত শক্ত রাখা। আপনার ক্ষেত্রে যেটা ভালো মানায় সেটা ব্যবহার করুন অথবা ডেনটিস্টের পরামর্শ নিন।

৪)  ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করুন

ডেন্টাল ফ্লস

ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করা দাঁত ব্রাশ করার মতই দরকারি। কারণ, এটা দাঁতের ওপরে ময়লার স্তর জমতে দেয় না, ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে দেয় না এবং যেসব জায়গায় ব্রাশের ব্রিস্টল পৌঁছাতে পারে না সেসব জায়গায় দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবারের কণা পরিষ্কার করে।

ব্রাশ করার আগে আপনার ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করা উচিৎ, ফলে যেসব খাবারের কণা এবং ব্যাকটেরিয়া ফ্লসিং-এর কারণে বেরিয়া আসে সেগুলি আর আপনার মুখে থাকতে পারে না।

মনে রাখবেন আস্তে আস্তে ফ্লস ব্যবহার করতে হবে। এমনভাবে দাঁতের মাঝখানে ফ্লস রাখবেন না যাতে আপনার মাড়ি বা দাঁতের সমস্যা হয়। আস্তে আস্তে ডেন্টাল ফ্লস চালান। প্রতিটা দাঁতের ফাঁকে ফ্লস ব্যবহার করুন।

যদি ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে সমস্যা বোধ করেন বা ভালোভাবে ব্যবহার করতে না পারেন তাহলে প্লাস্টিক বা কাঠের  টুথপিক ব্যবহার করুন। যেভাবে ফ্লস ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে একই ভাবে টুথপিক ব্যবহার করুন।

দুই. কীভাবে মাজবেন

১) অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট ব্যবহার করুন

অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট

ব্রাশ করার ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। বেশি টুথপেস্ট ব্যবহার করলে খুব অল্প সময়ে তাড়াতাড়ি বেশি ফেনা হয় এবং আপনি তাড়াতাড়ি ব্রাশ করা সেরে ফেলেন। তাছাড়া এতে ফ্লুরাইড টুথপেস্টের পেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

যদি ব্রাশ করা যন্ত্রণাদায়ক হয় তাহলে খুব আস্তে আস্তে ব্রাশ করুন এবং সংবেদনশীল দাঁতের জন্য উপযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করুন।

২) মাড়ির সাথে আপনার টুথব্রাশ ৪৫ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে রাখুন

মাড়ির সাথে টুথব্রাশ ৪৫ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে

আস্তে আস্তে ওপর থেকে নিচে বা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্রাশ করুন। ডান থেকে বামে বা বাম থেকে ডানে সোজাসুজি ব্রাশ করবেন না।

৩) কমপক্ষে তিন মিনিট ধরে ব্রাশ করুন

একবারে অল্প কয়েকটি দাঁত ব্রাশ করুন। এভাবে ব্রাশ করলে প্রতি দাঁত ব্রাশ করতে ১২ থেকে ১৫ সেকেন্ড ব্যয় হবে। যদি আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাহলে আপনার মুখ চার অংশে ভাগ করুন: উপরের বাম দিক, উপরের ডান দিক, নিচের বাম দিক এবং নিচের ডান দিক। যদি প্রতি অংশে আপনি ৩০ সেকেন্ড ব্রাশ করেন তাহলে আপনি পুরা ২ মিনিট ধরে ব্রাশ করবেন।

যদি ব্রাশ করতে বিরক্তি বোধ করেন তাহলে টিভি দেখার সময় বা গান শোনার সময় ব্রাশ করুন। পুরা একটা গানের সময় ব্রাশ করার অর্থ হলো আপনি সম্পূর্ণ ব্রাশ করে ফেলেছেন।

৪) তালু ব্রাশ করুন

আপনার ঠোটের সাথে লম্বাভাবে ব্রাশ রাখুন অথবা এমনভাবে রাখুন যাতে ব্রাশের ব্রিস্টল আপনার মুখের নিচের তালুর সামনের অংশে থাকে। ব্রাশ ভিতরে ঢোকান এবং বাইরে আনুন, এবং পিছন থেকে সামনে আনুন। মুখের অন্য অংশেও একইভাবে ব্রাশ করুন। নিচের তালু হয়ে গেলে উপরের তালু একইভাবে ব্রাশ করুন।

৫)  দাঁতের ভিতরের দিক ব্রাশ করুন

 দাঁতের ভিতরের দিক ব্রাশ

ব্রাশ এমনভাবে রাখুন যাতে ব্রাশের মাথা আপনার মাড়ির দিকে তাক করা থাকে। প্রতিটা দাঁত এভাবে ব্রাশ করুন।

ডেন্টিস্টরা বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিচের পাটির সামনের দাঁতগুলির ভিতরে ব্রাশ করা হয় না। সুতরাং এই ব্যাপারে লক্ষ্য রাখুন।

৬)  আস্তে আস্তে আপনার জিহ্বা ব্রাশ করুন

আপনার দাঁত পরিষ্কার করার পর ব্রাশের ব্রিস্টল দিয়ে আস্তে আস্তে জিহ্বা পরিষ্কার করুন। বেশি জোরে চাপ দিবেন না, বেশি জোরে চাপ দিলে টিস্যু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। জিহ্বা ব্রাশ করলে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হয় না এবং আপনার জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে না।

তিন. দাঁত মাজা শেষ এবার?

১) মুখ ধুয়ে ফেলুন

কাপ থেকে এক চুমুক পানি নিন অথবা কল থেকে হাত দিয়ে পানি নিন। ভালোভাবে কুলি করে ফেলে দিন।

যদি আপনার দাঁতে ক্যাভেটিজ থাকে তাহলে পানি দিয়ে কুলি না করাই ভালো। অথবা অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে কুলি করুন। কিন্তু অনেকেই এর বিরোধীতা করে থাকে কারণ, এতে ফ্লুরাইড পেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে কুলি করে ফেললে ফ্লুরাইড টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করার আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না।

২) ব্রাশ ধুয়ে ফেলুন

পানির ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে তাতে কয়েক সেকেন্ড ব্রাশ ধরে রাখুন, এতে ব্রাশ থেকে ব্যাকটেরিয়া চলে যায়। আপনি যদি ভালোভাবে ব্রাশ না ধুয়ে থাকেন তাহলে পরের বার ব্রাশ করার সময় পুরোনো ব্যাকটেরিয়া আপনার মুখে প্রবেশ করবে। এমন জায়গায় ব্রাশ রাখুন যাতে সেটা ভালোভাবে শুকায়।

৩) ফ্লুরাইড মাউথওয়াশ দিয়ে কুলি করুন

ছোট এক চুমুক মাউথওয়াশ নিয়ে ভালোভাবে কুলি করে ফেলে দিন। সাবধান থাকতে হবে যাতে পেটে না যায়।

৪)  লবণ পানি দিয়ে কুলি করুন

তারপরে শুধু পানি দিয়ে কুলি করুন। লবণ পানি দিয়ে কুলি করা হলো মুখ পরিষ্কার রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়।

৫)  দিনে অন্তত দুইবার ব্রাশ করুন

বেশিরভাগ ডেন্টিস্ট দিনে দুইবার ব্রাশ করার পরামর্শ দেন।

একবার সকালে এবং আরেকবার ঘুমাতে যাওয়ার আগে। যদি দিনের মধ্যে আরো একবার আপনি ব্রাশ করতে পারেন তাহলে আরো ভালো। আর দিনের মূল খাবারের মাঝে স্ন্যাকস খাওয়া এড়ানোর চেষ্টা করুন। কারণ এতে দাঁতের ফাঁকে খাবারের কণা আটকে থাকে এবং মুখের ভিতরে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যায়।

Leave a Comment