নাইকি লোগো বানিয়েছিল মাত্র ৩৫ ডলারে!

নাইকির লোগো সুশ

পোশাক ও খেলাধুলার সরঞ্জাম বানানোর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নাইকি। নাইকির লোগোর নাম সুশ (Swoosh)। নাইকি নামের চেয়ে নাইকির এই চেকমার্ক লোগোটির পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা বেশি।

নাইকির ‘সুশ’ লোগো তৈরি করেছিলেন ক্যারোলিন ডেভিডসন। লোগো তৈরির সময়ে তিনি আমেরিকার পোর্টল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গ্রাফিক্স ডিজাইনিংয়ের ছাত্রী ছিলেন। ১৯৭১ সালে যাত্রা শুরু করে নাইকি। এত দিনে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত লোগোর একটিতে পরিণত হয়েছে এই লোগোটি।

শুরুতে লোগোটি পছন্দ করেননি নাইকির প্রতিষ্ঠাতা ফিল রাইট

তখন বসন্তকাল ছিল। নাইকির তিনজন প্রতিষ্ঠাতার সামনে ক্যারোলিন একটার পর একটা ডিজাইনের স্কেচ দেখাচ্ছিলেন। শেষপর্যন্ত সেই তিনজন ক্যারোলিন ডেভিডসনের প্রিয় ‘চেকমার্ক’ লোগোটির চারদিকে গোল দাগ দেন। চেকমার্কটির প্রতি তাদের মনোযোগ দেখে সচেতন হয়ে ওঠেন ক্যারোলিন ডেভিডসন। তাদের প্রতিক্রিয়ার জন্য ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন।

নাইকির প্রতিষ্ঠাতা ফিল নাইট তখন বলেছিলেন, “এটা আমার খুব একটা পছন্দ না, কিন্তু পরে হয়ত আমার এটা ভাল লাগবে।”

এত বছরে ‘সুশ’ পরিণত হয়েছে প্রয়োজন এবং সম্ভাবনার প্রতীকে। এখন এই লোগোটি পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত চিহ্নগুলিরও একটি। তারচেয়ে বড় কথা এই লোগোটি নিজেই নিজের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোগোটির সাথে এর খেলাধুলার পোশাক এবং সরঞ্জাম তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান অরেগন-এর নাম আর উল্লেখ করতে হয় না। সেই সময় কেউ ভাবতে পারেনি এই লোগোটি এক সময় এসে এত জনপ্রিয় হবে, এতটা আবেদন তৈরি করবে। বিশেষ করে ক্যারোলিন ডেভিডসন তো ভাবতেই পারেননি।

একটি সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিন বলেছেন, লোগো তৈরি করার একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অ্যাডিডাসের স্ট্রাইপ এবং ব্লু রিবন স্পোর্টসের লোগোর হাল্কা ভাবের বাইরে যাওয়া।

ক্যারোলিন তখন গ্রাফিক্স ডিজাইনিং পড়তেন

ক্যারোলিনের সাথে নাইকির ফিল নাইটের দেখা হয়েছিল ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে। ক্যারোলিন তখন পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির গ্রাফিক ডিজাইন ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা করেন। কোনো একটি ক্লাস ক্যারোলিন তার সমস্যার কারণে করতে পারছেন না। এই ব্যাপারটি আড়াল থেকে শুনতে পান নাইট। তারপর ডিপার্টমেন্টের হলওয়েতে ক্যারোলিনের সাথে কথা বলেন তিনি।

ক্যারোলিন বলেছেন, নাইট আমাকে বলেছিলেন, “এক্সকিউজ মি, আপনিই কি সে, যে বলছিল অয়েল পেইন্টিং-এর ক্লাস নেয়ার খরচ বহন করতে পারবে না?” আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম, কে এই লোক, আর এইসব জানলই বা কীভাবে! তারপর ফিল নাইট আমাকে নিজের পরিচয় দেন এবং বলেছিলেন তিনি অ্যাকাউন্টিং পড়া্ন। কিন্তু নাইট তখন পাশাপাশি ব্লু রিবন স্পোর্টস চালাতেন। ব্লু রিবন স্পোর্টস সে সময় অনিতসুকা কোম্পানি লিমিটেডের তৈরি টাইগার সু এর পশ্চিমাঞ্চলের ডিস্ট্রিবিউটর ছিল।

নাইট ক্যারোলিনকে বলেন অনিতসুকা কোম্পানির জাপানী এক্সিকিউটিভদের সাথে মিটিং এর জন্য কিছু চার্টস এবং গ্রাফ তৈরি করতে তার একজন পার্ট টাইম গ্রাফিক আর্টিস্ট দরকার। নাইট বলেছিলেন, “আপনি যদি আগ্রহী থাকেন তাহলে আপনাকে আমি সেগুলির জন্য ঘণ্টা প্রতি দুই ডলার করে দিব।” ক্যারোলিন তখন রাজি হয়েছিলেন। তিনি মূলত চার্টস এবং গ্রাফিক্সের কাজ করতেন নাইটের জন্য।

এরপর নাইট তাঁকে নতুন কাজ দেন। একটি লোগো। ক্যারোলিন বলেন, “নাইটের সাথে অনিতসুকা কোম্পানির টানাপোড়েন তখন বাড়ছিল। এর ফলে তার মনে হয় নিজের কিছু একটা করা উচিৎ। তার মেক্সিকোর গুয়াদালাহারাতে একটি ফ্যাক্টরি ছিল। ফুটবল বা সকার খেলার জুতা তৈরি করার জন্য ফ্যাক্টরিটি রেডি ছিল। নাইটের নিজস্ব একটা পরিচয় তৈরি করা দরকার ছিল সে সময়।” ১৯৭১ সালের কোনো একসময় নাইট ক্যারোলিনকে বলেছিলেন এই জুতার একটি লোগো লাগবে।

নাইট ক্যারোলিনকে আরো বলেছিলেন, লোগোটি যেন কোনোভাবে গতি নির্দেশ করে এবং অ্যাডিডাস, পুমা অথবা অনিতসুকা’র টাইগারের মত না দেখায়। ক্যারোলিন বলেছেন, একই সময়ে এটাও বোঝা যাচ্ছিল তিনি থ্রি স্ট্রাইপের লোগোর প্রতি দুর্বল ছিলেন। তিনি অ্যাডিডাসের লোগোটি পছন্দ করতেন। এটা আংশিকভাবে আমার জন্য সমস্যাও তৈরি করেছিল। কেউ যখন কোনোকিছু ভালোবাসে, সে কোনো একভাবে মানুষকে তা দেখাতে চেষ্টা করে।”

লোগোটি ফাইনালের জন্য বাড়তি সময় পাননি ক্যারোলিন

ক্যারোলিন যখন লোগোটি করতে গিয়েছিলেন তখন তিনি ভালোভাবেই জানতেন খুব সিম্পল এবং দেখতে ফ্লুইড একটা লোগো তৈরি করা কত কঠিন। ক্যারোলিন এই লোগো তৈরি করার সময় স্টুডিওতে একের পর এক লোগো এঁকেছেন।

ক্যারোলিন প্রথমে জুতার ছবি এঁকে আলাদা টিস্যুতে লোগো আঁকতেন। তারপর সেই টিস্যুতে আঁকানো লোগোটি আঁকানো জুতার উপর রাখতেন। লোগো নিয়ে কাজ শূরু করার দুই তিন সপ্তাহ পরে ব্লু রিবনের অফিসে নাইট, জেফ জনসন এবং বব উডেলের সামনে ক্যারোলিন তার কাজ দেখান। ক্যারোলিন নাইটের হাতে পাঁচ ছয়টি লোগোর ফাইন্যাল কপি দিয়েছিলেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নাইকি’র প্রেসিডেন্ট থাকা উডেল বলেছেন, এটা পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছিল কোনটা নেয়ার মত আর কোনটা নেয়ার মত না।

নাইট লোগো বেছে নেয়ার পর ক্যারোলিন তার কাছে সময় চেয়েছিলেন কাজটা আরেকটু সংশোধন করার জন্য। উডেল বলেছেন, আমাদের খুব তাড়াতাড়ি এটা দরকার ছিল। নাইট চায়নি এটা ঘষামাজা করার জন্য তাঁকে আরো এক সপ্তাহ সময় দিতে।

ক্যারোলিন জানতেন না কতক্ষণ তিনি এই লোগোটার পিছনে কাজ করেছিলেন। তাঁর অনুমান ১৭ ঘণ্টারও বেশি।

নাইকির নাম প্রথমে ভাবা হয়েছিল ডাইমেনশন সিক্স

‘নাইকি’ নামে নিবন্ধন করা আরো এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। তখন ব্লু রিবনের প্রথম কর্মচারী জনসন বলেন, নাইটের পছন্দ করা ‘ডাইমেনশন সিক্স’ এর পরিবর্তে বিজয়ের গ্রীক দেবীর নামে নাম হতে পারে। তারপর ১৯৭১ সালের ১৮ জুন এই ‘চেকমার্ক’ লোগোটি ইউএস পেটেন্ট অফিসে রেকর্ডেড হয়। ক্যারোলিন বলেছেন, আমি এটা পছন্দ করি। আসলেই করি। এটার দিকে তাকিয়ে থাকলে কখনোই ক্লান্ত হই না।

১৯৭৬ সালে নাইকি প্রথম বিজ্ঞাপনী সংস্থা নিয়োগ দেয়। সিয়াটলের জন ব্রাউন অ্যান্ড পার্টনারস। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে নাইকি নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যবসা শুরু করে। জনসন বড়লোক হয়ে যায়। উডেল বড়লোক হয়ে যায়। নাইট বড়লোক হয়ে যায়। পরবর্তী তিন দশকে অরেগন কোম্পানি স্পোর্টিং সরঞ্জামের একটি পাওয়ারহাউজে পরিণত হয়। ‘সুশ’কে সব জায়গায়ই দেখা যেতে থাকে – জুতাতে, টিশার্টে, জার্সিতে, মোজাতে, প্যান্টে, কোটে, হ্যাটে, অলিম্পিক স্টেডিয়ামের ব্যানারে, ফুটবল গোলরক্ষকের গ্লোভসে, বেইসবল ক্যাচারের বুকের চেস্ট প্রটেক্টারে এবং আরো আরো অনেক জায়গায়।

মাত্র পঁয়ত্রিশ ডলার পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ক্যারোলিন

ক্যারোলিন এই লোগোর জন্য বিল সাবমিট করেছিলেন ৩৫ ডলার। কোম্পানি তখন অর্থ সংকটে আছে।এখন এটা শুনে অনেক মানুষই অবাক হয়। কিন্তু এই পারিশ্রমিক নিয়ে ক্যারোলিনের কোনো অনুযোগ বা ক্ষোভ ছিল না। ক্যারোলিন ৩৫ ডলার পারিশ্রমিকেই কাজটি করতে রাজি হয়েছিলেন। কিছুদিন নাইকিতে কাজ করার পর ১৯৭৫ সালে এসে ক্যারোলিন নাইকির কাজ ছেড়ে দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং কাজ শুরু করেন। ১৯৮৩ সাল, নাইকি তখন নিউইয়র্ক স্টক একচেঞ্জে বাণিজ্য শুরু করেছে। ফিল নাইট সিদ্ধান্ত নেন কোম্পানির লোগো তৈরি এবং কোম্পানির প্রথম দিকে কাজ করার জন্য ক্যারোলিনকে সম্মান জানাবেন।

ক্যারোলিনের জন্য সারপ্রাইজ পার্টি

উডেল ক্যারোলিনকে লাঞ্চের আমন্ত্রন জানান। উডেল তাঁকে ফোনে বলেন, ক্যারোলিন, ফিল এবং আমি আপনাকে অনেকদিন দেখি না। আসেন আমরা একসাথে লাঞ্চ করব। পরে দেখা যায় এটা ছিল তাঁর সম্মানে একটি সারপ্রাইজ পার্টি। ভিডিওতে দেখা যায় ১৯৮৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, ক্যারোলিন নাইকি’র ওয়াশিংটন কাউন্টি অফিসে ঢুকছেন। উডেল নাইকির অন্যান্য কর্মচারীদের সাথে দরজায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। তারপর নাইট ক্যারোলিনের হাতে একটি বাঁধানো সার্টিফিকেট দেন। সার্টিফিকেটটি নাইট এবং উডেলের স্বাক্ষর করা ছিল। তাঁরা ক্যারোলিনকে সার্টিফিকেটটি জোরে পড়তে বলে। সার্টিফিকেটটিতে তাঁকে নাইকির লোগো ‘সুশ’ এর ডিজাইনার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং অন্যান্য আইনি বাধ্যবাধকতার কথা লেখা ছিল।

সার্টিফিকেটের একটা জায়গায় নাইট জোক করে লিখেছিলেন, ক্যারোলিন সৌভাগ্যবান, ৩৫ ডলারের চেকটি বাউন্স করেনি। এরপর উডেল তাঁকে ছোট একটি বাক্স দেন। সেই বাক্সে ক্যারোলিনকে ‘সুশ’ চিহ্নের একটি সোনার আংটি দেওয়া হয়। আংটির উপরে ছিল একটি ডায়মন্ড। কিন্তু এরপর দেয়া হয় সবচেয়ে বড় উপহার। ভিডিওতে দেখা যায় এরপর ক্যারোলিন কাদতে শুরু করেন। উডেল তাঁকে খামে ভরা নাইকির স্টক সার্টিফিকেট দেন। সেই স্টক সার্টিফিকেটে নাইকি কোম্পানির ৫০০ টি শেয়ার দেয়া হয় ক্যারোলিন ডেভিডসনকে। সেই সময়ে নাইকির ৫০০ শেয়ারের মূল্য ছিল আট হাজার ডলার। আজকের দিনে আঠারো হাজার ডলার। যদিও কোম্পানি বা নাইট কেউই এই দেয়ার ব্যাপারে কোনো চুক্তিতে ছিলেন না এবং কোনো বাধ্যবাধকতাও ছিল না।

ক্যারোলিন কখনোই সেই ৫০০ টি শেয়ার নাইকির স্টক থেকে বিক্রি করেননি। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত চারবার শেয়ার মার্কেট ভাগ হওয়ার ফলে সেই ৫০০ টি শেয়ার দাঁড়িয়েছে ৮০০০ শেয়ারে। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৬০ ডলার হলে ৮০০০ শেয়ারের মূল্য পাঁচ লাখ ডলার।

ক্যারোলিন ডেভিডসন এখন অরেগন-এর লিগ্যাসি এমানুয়েল হসপিটাল এন্যড হেলথ কেয়ার সেন্টারের রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ড হাউজে সাপ্তাহিক ভলান্টিয়ারের কাজ করেন।

Leave a Comment