নাইকি এবং অ্যাডিডাস কার লোগো এগিয়ে?

খেলাধুলার পোশাক ও সরঞ্জাম তৈরির জনপ্রিয় ও বিশ্বখ্যাত দুই প্রতিষ্ঠান নাইকি ও অ্যাডিডাস।

নাইকির আরম্ভ ১৯৭২-এ। অ্যাডিডাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল  ১৯২৪ সালে।  নাইকির লোগো ‘সুশ’ এবং অ্যাডিডাসের লোগো ‘ট্রিফয়েল’ও বেশ জনপ্রিয়। প্রতিষ্ঠান ছাপিয়ে লোগো দুটির আলাদা পরিচয় গড়ে উঠেছে সারা দুনিয়ায়।

লোগো দুটি শুধু দেখতেই আলাদা না, এদের অর্থ, ব্র্যান্ড ভ্যালু, মেসেজ ও উদ্দেশ্যগত ভাবে একটি থেকে আরেকটি  আলাদা। এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলি নির্ধারণ করে লোগো হিসাবে কোনটা কত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে সুশ লোগো এবং ট্রিফয়েল লোগোর তুলনামূলক আলোচনা থাকছে।

নাইকি সুশ  –  যেকোনো মূল্যে বিজয়

১৯৭২ সালে ফিল নাইট এবং বিল বাওয়ারম্যান নাইকি প্রতিষ্ঠা করেন। অরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাইন বিভাগের ছাত্রী ক্যারোলিন ডেভিডসন তখন এই কোম্পানির লোগো তৈরির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি নাইকির ‘সুশ’ লোগোটি তৈরি করেন। প্রথমে নাইকির মালিক কর্তৃপক্ষ ডিজাইনটি খুব একটা পছন্দ না করলেও এটাকেই কোম্পানি লোগো রাখার সিদ্ধান্ত নেন। লোগোটির মূল ডিজাইন ঠিক রেখে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে বদলঅনো হয়েছে। এখন নাইকির লোগো ‘সিঙ্গেল সুশ’। এতদিনে এই লোগোটি খেলার জগতে সবচেয়ে পরিচিত লোগো।

নাইকি লোগো
লোগোটি যেভাবে কাজ করে 

নাইকির লোগোটি নির্দেশ করে ‘একাই দাঁড়িয়ে থাকা’ বা ‘স্ট্যান্ড অ্যালোন’। লোগোটির সাথে কোম্পানির সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও এর ব্র্যান্ড ভ্যালুর সাথে সম্পর্ক রয়েছে। ‘সুশ’ লোগোটি গ্রীক ডানাঅলা বিজয়ের দেবী নাইকি থেকে এসেছে। তেমন ভাবে বাস্তবের কোনো বস্তুর মিল নেই এর লোগোটির, ফলে ‘সুশ’ যারা দেখে তারা নিজেদের মত একটা ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে লোগোটির। সুশকে হাসি, চেক সাইন, ডানা ইত্যাদি একেক ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

নানান আলাদা ব্যাখ্যার একটা মিলের জায়গা গতি। লোগোটির বাঁকানো শেইপ এবং দুই মাথার দিকের তীক্ষ্ণ কোণা বাঁকানো পথের নির্দেশ করে। আর তার অর্থ হচ্ছে গতি।

সামনে থেকে দেখলে নাইকির লোগোর ডান পাশের উপরের কোণা ইঙ্গিত করে পজিটিভ অগ্রগতি। আর বাম পাশে এর বিপরীত দিকটা নির্দেশ করে। বাম পাশের নিচের অংশ ইঙ্গিত করে টেনশন। এটার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, খেলাধুলা বা সবক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছাতে হলে শ্রম দিতে হবে।

নাইকির লোগো  চ্যালেঞ্জ গ্রহণ এবং শক্তি ও একাগ্রতার মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার গল্প বলে।এই লোগোটি গতির একটি গ্রাফিক রিপ্রেজেন্টেশন। এবং এর নাম ‘সুশ’ শুনতে দ্রুত চলে যাওয়া বাতাসের যে আওয়াজ তার মত।

সুশ-এর মানে হচ্ছে বাতাসের শব্দ বা দ্রুত বেগে যায় এমন কিছুর শব্দ। গ্রাফিক এবং সাউন্ড দুটি মিলে লোগোটির ক্ষেত্রে খুব ভালোভাবে কাজ করে। এটা একধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং এই উত্তেজনা এক স্নায়ু থেকে আরেক স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে।

মেসেজ

সুশ লোগো নাইকির মূল্যবোধগুলির সংক্ষিপ্ত রূপ। নাইকি কোম্পানির মূলকথা: গতি, শক্তি, দক্ষতা এবং যেকোনো মূল্যে জয়ী হওয়া। নাইকির লোগোটির মেসেজ এর প্রতিযোগী লোগোগুলির মেসেজ থেকে মৌলিকভাবে আলাদা।বিশেষ করে অ্যাডিডাস থেকে অবশ্যই আলাদা।

অ্যাডিডাস – অংশগ্রহণ করাটাই বড় কথা

অ্যাডিডাস logo

১৯২৪ সালে অ্যাডলফ ডাসলার অ্যাডিডাস প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাডিডাসের বর্তমান লোগো ট্রিফয়েল থ্রি স্ট্রাইপ ১৯৯৬ সাল থেকে চালু হয়। এর আগে অ্যাডিডাসের লোগো ছিল ট্রিফয়েল ফ্লাওয়ার। ট্রিফয়েল ডিজাইন করেছেন স্ট্যান স্মিথ এবং রড লেভার।

অ্যাডিডাস ব্র্যান্ড মেসেজ হিসেবে নাইকির মত একই ধরনের কথা বললেও নাইকির লোগোর মত এতটা ভালোভাবে এর ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে পারে নি। এই কারণে ৯০-এর দশকে অ্যাডিডাসের মার্কেট আধিপত্য আমেরিকান কোম্পানির কাছে চলে যায়। প্রতিদিন পরার মত জুতা হিসাবে অ্যাডিডাসের স্নিকার্সের জনপ্রিয়তা অনেক। কিন্তু অ্যাডিডাসের স্পোর্টস সু বা খেলাধুলার জুতা অত জনপ্রিয় না। অ্যাডিডাস তার জুতাকে খেলাধুলার জুতা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য সবসময়ই প্রমোট করেছে।এখন অ্যাডিডাস কোয়ালিটি, দক্ষতা ও প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক অগ্রসর হলেও ব্র্যান্ড হিসাবে নাইকির চেয়ে কম উত্তেজনাকর এবং এর ‘কুল’ ভাবটাও কম।

৮০ ও ৯০ এর দশকের টিপিক্যাল হেডোনিস্ট কালচার খুব দ্রুত হ্রাস পাওয়াটা অ্যাডিডাসের জন্য বড় পরিবর্তন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অ্যান্টি গ্লোবাল দৃষ্টিভঙ্গি সামনে চলে আসে এবং নাইকি ও অ্যাডিডাসের মত হেডোনিস্টিক ও ভোগবাদী ব্র্যান্ড ভ্যালু মারাত্মকভাবে সমালোচিত হয়।

নাইকি না করলেও অ্যাডিডাস তখন নিরাপত্তা, সাধারণত্ব এবং সামজিক দায়বোধের ব্যাপার বেশ বড় করে ফেলে। এই ব্যাপারটি তাদের লোগোতেও প্রভাব ফেলেছে।

অ্যাডিডাসের লোগার মূল মেসেজটি পারফরমেন্সের কথা বলে না, বলে সিকিউরিটির কথা। অ্যাডিডাসে লোগো লক্ষ করলে দেখা যাবে লোগোটি বাম থেকে ডানে সাইজে বড় হতে থাকে। এটা সংহতি বাড়ানোর ইঙ্গিত করে।

অ্যাডিডাসের লোগোর আউটলাইন, এর সলিড কালার এবং ব্যাকগ্রাউন্ড কন্ট্রাস্ট দৃঢ়তা এবং সিমপ্লিসিটির কথা বলে। লোগোটির ত্রিভূজের মত আকারের উদ্দেশ্য হলো দৃঢ় এবং নিখাদ পিরামিডের কথা মনে করিয়ে দেওয়া।

লোগোটির বারগুলিকে সিঁড়ি হিসেবে দেখা যায়। প্রতিটা ধাপই সর্বোচ্চ স্থানের কাছাকাছি। এই লোগোটিতে নাইকির লোগোর মত মাত্র একটা শক্তিশালী কোনো মুভমেন্ট নেই। এই লোগোটি বরং অ্যাথলেটদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা নির্দেশ করে।

মেসেজ

অ্যাডিডাসের লোগো ‘যে কোনো মুল্যে জয়ী হওয়া’ ব্যাপারটিকে হাইলাইট করার চেয়ে কমিটমেন্ট, দৃঢ়তা এবং একাগ্রতার স্পোর্টিং ভ্যালুর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয় — যেখানে অংশগ্রহণ করাটাই সবচে বড় কথা।

Leave a Comment