ভ্রমণ

নতুন কিছু খুজে দেখার জন্যে কলকাতা একটি স্বপ্নের শহর

এই শহরের উত্তরদিকটা এখনো সেই সাম্রাজ্যবাদী একটি ব্যবসায়ী নগরীই রয়ে গেছে। এই রাস্তাগুলো তে একটু শীতের দুপুরগুলিতে হাটলে মনে হবে এই বোধহয় প্রধান সড়ক হতে ঘোড়া ছুটিয়ে কোন ব্রিটিশ সৈনিক চলে যাবে। গলির মাঝে পলেস্তারা খসে পড়া পুরোনো ভবনগুলির গায়ে বসে মাটির ভাড়ে করে চা খেতে খেতে দেখা যাবে ধুতি পাঞ্জাবি পড়া এক প্রৌঢ় হয়ত আপনাকেই দেখছে।

যেতে হবে কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউজে, ১২৫ বছরের এলবার্ট হলের সব আগের মতই আছে শুধু এসেছে হালের প্লাষ্টিকের চেয়ারগুলি। সেই বেয়ারাগুলো তাদের সেই সাদা কাপড় পড়ে হেসে আপনাকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত কাটলেট আর কফি নিয়ে। চারমিনারের সাথে কফির জুড়ি আর অলস দুপুরের কফি হাউজ, কম্বিনেশনটা দারুন।
সন্ধ্যার সময় হাটতে হাটতে হাওড়া ব্রীজের নীচে যেতে হবে। গংগার দুপাড়ের শহরকে বেধে রেখেছে সেই ১৯৪৩ সাল থেকে। সন্ধ্যাবেলা সেই বিরাট আলোক ঝলমলে লোহার অবয়বকে দেখতে দেখতে নদীর পাড় ধরে জেমস প্রিন্সেপ ঘাট থেকে খিদিরপুর ব্রীজ দেখতে দেখতে চা খাওয়ার জুড়ি নেয়া ভার।
                                                                           
কলকাতার প্রতিটা রাস্তার একটা নিজস্ব গল্প আছে, সেটা কুমারটুলির কুমারপল্লীর বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীর, এসপ্লানেডের ট্রামডিপোর বা হগ মার্কেটের পুরানো সব ফুলের। প্রতিটা গল্পই আলাদা কিন্তু প্রতিটা গল্পই স্বতন্ত্র।
এক অলস দুপুরে ময়দানের পাশ থেকে হেটে যেয়ে ডানে তাকালে পড়বে ধুসর অহংকারী ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল কে যে গত ১১৩ বছর ধরে তার গরিমা বজায় রেখেছে কলকাতার বুকে। সুন্দর পাশ্চাত্য রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে সামনে চোখ পড়বে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল গীর্জাকে যা গথিক স্থাপত্যের এক জ্বলজ্বলে নিদর্শন। ১৮৯৭ এবং ১৯৩৭ এর ভুমিকম্পের পরে নতুন করে গড়ে তোলা চার্চটির মোহময় আকর্ষন এড়ানো অসম্ভব।
কলকাতা শহর যেভাবে সবার নজর কাড়ে তার প্রধান একটি কারন হল প্রদোষ মিত্তির। ফেলুদার তদন্তে সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি উঠে এসেছে বারবার। ১৮ শতকের মাঝে বিলের মধ্যে গড়ে ওঠা এক কবরখানা আজ সবচে ঝা চকচকে পার্ক স্ট্রীটের বুকে একমাত্র পুরাতন কলকাতা হিসাবে তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে প্রতিক্ষনে। ১৬০০ কবরের মাঝে সবচে নতুন যে কবরটি খোড়া হয়েছে তার বয়স হয়েছে সবে ২১০ বছর। শোনা যায় সন্ধ্যার সময় এলবার্ট সাহেব কাউকে কাউকে দেখাও দেন হাটা পথে, ভয় দেখিয়ে না হ্যাট নামিয়ে অভিবাদন আর কি!
                                                               
যেতে হবে শিয়ালদহ স্টেশনে, সেখানে মানুষের মেলা আর প্রতি মিনিটে আসা ট্রেন আর ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলিকেও দেখতে ভাল লাগে। কি করা শহরটা যে ভালো লাগার। সমরেশ সুনীল আর শীর্ষেন্দুর শহরে হাটতে হাটতে আপনার সাথে দেখা হবে, সেই সময়ের নবীন কুমার, দুরবীনের কৃষ্ণকান্ত, উত্তরাধিকারের অনিমেষ, মাধবীলতা অথবা পুর্ব পশ্চিমের বাবলুর।
সবচে বর্ণাঢ্য শব্দমালার সামান্য শব্দেও বাধা যাবেনা এমন এক শহর কলকাতা। আপনি হেটে যাবেন এক আধুনিক শহরের পথে আপনার পাশ থেকে শব্দ করে যাবে ১৮৭৩ সাল থেকে চলা ট্রাম যার সবচে খারাপ কাজ ছিল তার ১৪৫ বছরের জীবনে কেড়ে নেয়া শব্দের জাদুকর জীবনানন্দ দাসকে। কলকাতার পানিপুড়ি, ধর্মতলার এগরোল, পুরানো কলকাতার হাতে টানা রিক্সা, রাণী রাসমনির দক্ষিনেশ্বর, ক্যানিং স্ট্রিটের মাগেন ডেভিড সিনাগগ, টিপু সুলতান মসজিদ।
এছাড়া আরো অনেক  বিস্ময়কর, সুন্দর আর অধরা কলকাতা।

 

 

লিখেছেন  অমিত সমাদ্দার  (TOB)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button