কবে শুরু ফুটবল খেলার?

ফুটবল এতটাই প্রাচীন খেলা যে, কারা কখন প্রথম এটা খেলতে শুরু করেছিল সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। তবু কোন কোন সংস্কৃতিতে ফুটবল ও এ ধরনের খেলার চল ছিল সেই সম্পর্কে গবেষকরা কিছু তথ্য উপাত্ত পেয়েছে।

ফুটবলের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে হলে একে দুটো সময়ে ভাগ করতে হয়। এক, প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বছর আগের কালের ফুটবল; দুই, বর্তমান কালের আধুনিক ফুটবল।

ফুটবলের প্রাচীন উৎপত্তি

ঐতিহাসিক প্রমাণাদি এবং ঐতিহ্য অনুসরন করলে সহজেই বলে দেওয়া যায়, ফুটবল প্রথম খেলা হয়েছিল মিশর, চীন ও রোমে। ফুটবলের প্রাথমিক ও মৌলিক নিয়মগুলি বছরের পর বছর ধরে চলে এসেছে তখন থেকে। এমনকী মধ্যযুগেও সেটা খুব একটা বদলায় নি।

মিশরের ফুটবল

খ্রীষ্টের জন্মের আড়াই হাজার বছর আগের লিনেনের তৈরি ফুটবল পাওয়া গেছে মিশরের সমাধিতে। বল যাতে আরো বেশি লাফাতে পারে সেজন্য কিছু বন্য প্রাণীর অন্ত্র ও চামড়া ব্যবহার করা হয়েছে। ফুটবলের ওপরে আঁকা ছবি দেখে গবেষকদের ধারণা শস্য উৎপাদনের খুশিতে আয়োজিত ভোজের সময় মিশরীয়রা মাটির প্রতি নিজেদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ফুটবল খেলত। এর প্রায় দুই হাজার বছর পরে চীনে ফুটবলের মত একটি অন্য ধরনের খেলার আবির্ভাব ঘটে।

চীনের ফুটবল

আনুমানিক ৪৭৬ থেকে ২২১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে চীনে সুজু নামের এক রকমের খেলার চল ছিল। সুজু শব্দের অর্থ, বলে পা দিয়ে লাথি মারা। চামড়ার একটি বলের মধ্যে পালক ঢুকিয়ে তারা সেটা আয়তাকার একটি মাঠে খেলত। গোল দেবার জন্য দুইটি কাপড় বাঁধা স্তম্ভের মাঝখান দিয়ে বলটিকে ঢোকাতে হত।

খেলাটি জনপ্রিয় ছিল কারণ সেনাবাহিনীর সৈনিকদের শারীরিকভাবে সক্ষম রাখতেই এই প্রতিযোগিতামূলক খেলাটি খেলা হত। এর জনপ্রিয়তার কারণে একটা সময় রাজকীয়ভাবে সুজু প্রতিযোগিতার আয়োজন করা শুরু হয়। এতে সামরিক বাহিনির পাশাপাশি নাগরিক পুরুষ ও মহিলারাও অংশগ্রহণ করতে পারত।

এখনকার ফুটবল খেলার মত তখনকার সময়ও বাহু এবং হাত ছাড়া শরীরের যেকোন অংশ দিয়ে ফুটবলকে ছোঁয়া যেত। আর খেলোয়াড়রা নিয়ম মানছে কিনা সেটা দেখার জন্যে রেফারিও থাকত।

এখনকার মত তখনও খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো যেত। এতে সাধারণত দুই থেকে ১০ জন খেলোয়াড় থাকতে পারত। রাজকীয় সুজু খেলায় মোট ১২ থেকে ১৬ জন খেলোয়াড় থাকতে পারত। তবে কেবল গোলের ওপর নয়, খেলোয়াড় কেমন খেলছে তার ওপর নির্ভর করে নাম্বার যোগ-বিয়োগ ও জয়ী দল বাছাই করা হত।

১৭ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে সুজু খেলার জনপ্রিয়তা চীনে কমে যায়। তবে যখন চীনারা সুজু খেলছিল, ঠিক একই সময়ে রোমানরাও এক ধরনের ফুটবল খেলছিল।

রোমান ফুটবল

রোমান ফুটবল খেলায় কোন নিয়ম ছিল না। প্রতি দলে ২৭ জন করে মোট ৫৪ জন খেলোয়াড় খেলত খেলাটি। গোলের ওপর নির্ভর করে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা হত। এর জনপ্রিয়তার কারণে প্রথম দিককার অলিম্পিক গেমসেও এই খেলাটির জায়গা করে দেওয়া হয়। যদিও বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই আহত অবস্থায় ফিরে যেত।

তবে সিসেরোর বক্তব্য অনুসারে এটা ছাড়াও সাধারণ মানুষ, বিশেষত যুবকদের মধ্যে রাস্তায় বল ছোড়াছুড়ির একটা খেলা হত। যেখানে সবাই বলে লাথি মারত।

সিসেরো লেখেন, এই খেলায় বলের আঘাতে একজন মানুষ মারা যায়। ঘটনার সময় একজন নাপিত খদ্দেরের চুল কাটছিল। ঠিক তখন বল এসে তার হাতে লাগে এবং হাতের ছুরি মানুষটির গলার ভেতর দিয়ে চলে যায়।

মধ্যযুগীয় ফুটবল

ইংরেজরাই মধ্যযুগে ফুটবল খেলাকে জীবন্ত করে রেখেছিল। ১৪ শতাব্দীর মাঝামাঝি ‘জনগণের ফুটবল’ নামে একটি খেলা প্রচলিত ছিল। নিয়ম ছাড়া এই খেলায় যত খুশী খেলোয়াড় যোগ দিতে পারত।

মারামারি না বাঁধা পর্যন্ত রাস্তার এই খেলা চলত। যেহেতু খেলার কারণে রাস্তার লোকজন আহত হত এবং অনেক সময় দাঙ্গা বেঁধে যেত, উচ্চপদস্থরা কতৃপক্ষরা এই খেলা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু অত্যধিক জনপ্রিয় হওয়ায় ফুটবল খেলা থামে নি। এই শতাব্দীর শেষের দিকে ইংরেজ সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায় ফুটবল খেলা।

আধুনিক ফুটবলের শুরু

ফুটবলের জনপ্রিয়তা যদিও বাড়তে থাকে, এর কারণে সৃষ্ট ঝামেলার কারণে খেলাটি বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু সেটা অসম্ভব হওয়ায় একটা সময় সবাই এক হয়ে ১৯ শতকের ক্লাব তৈরি করে ফুটবল খেলার কিছু নিয়ম বানায়। যা কিনা বর্তমান ফুটবল খেলায় মেনে চলা হয়।

ফুটবল সংঘ

১৮৬০ সালের শুরুতেই ফুটবল খেলার কিছু কঠোর নিয়ম তৈরি করে ক্লাব। ফলে ফুটবল তার বর্তমান আদল পায়।

কিন্তু সমস্যা ছিল প্রত্যেকটি স্থানের ক্লাব তাদের ইচ্ছেমতন বিভিন্ন রকমের নিয়ম বানাতে শুরু করে। ফলে বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে ঝামেলার সৃষ্টি হয়।

১৮৬৩ সালে লন্ডনের ১২ টি ফুটবল ক্লাব এক হয়ে এই সমস্যার সমাধান আনে। তারা একটি ফুটবল সংঘ সৃষ্টি করে যার কেবল এক ধরনেরই নিয়ম থাকবে এবং প্রত্যেককেই সেই নিয়ম অনুসারে খেলতে হবে। লন্ডন থেকে খুব দ্রুত খেলাটি ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ যেমন স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন এসব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এই সব দেশ এক হয় এবং ফুটবলের আন্তর্জাতিক সংঘ ফিফা তৈরি করে। বিভিন্ন স্থানে এর বিভিন্ন নাম হলেও আমেরিকায় একে সবাই ‘সকার’ বলে জানে।

‘সকার’ নামটি এল কোথা থেকে?

ইংল্যান্ডে প্রথম রাগবি ফুটবল থেকে আলাদা করার জন্য সংঘ ফুটবলকে ‘সকার’ নাম দেওয়া হয়। প্রথম দিকে সবাই এটাকে ‘এসোকার’ এবং রাগবি ফুটবলকে ‘রাগার’ বলে ডাকত। এক সময় এসোকারের প্রথম এ লুপ্ত হয়। ধীরে ধীরে সকার ফুটবল এতটা জনপ্রিয় হয়ে যায় যে রাগবি থেকে আলাদা করে চেনার জন্য এর আর অন্য কোন নামের প্রয়োজন ছিল না।

Leave a Comment