লাইফ স্টাইল

চাকরীর ইন্টারভিউ বা ভাইভাতে সফল হবার সেরা কিছু টিপস

পড়া-লেখা শেষে অধিকাংশেরই লক্ষ্য থাকে ভালো মানের সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরি করার। চাকরির জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকার পরও অনেকের চাকরি হয় না। বাদ পড়ে যায় ইন্টারভিউ বোর্ডে এসেই।  নার্ভাসনেস ও গুছিয়ে প্রশ্নের উত্তর করতে না পারাই মূলত ইন্টারভিউ থেকে বাদ পড়ার কারণ। চাকরির ইন্টারভিউ এ প্রশ্ন করা হয় এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর সহ নার্ভাসনেস কাটানোর ট্রিকস নিয়ে হাজির হয়েছি এই কনটেন্টটি নিয়ে। 

ইন্টারভিউ কি

ইন্টারভিউ এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় সাক্ষাতকার। এই সাক্ষাতকারে নিজের সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পাশাপাশি দেখা হয় আত্মবিশ্বাস।

চাকরি প্রত্যাশি প্রত্যেকের জীবনেই ইন্টারভিউ একটি ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা অনেকে প্রিলিমিনারি কিংবা লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেও ইন্টারভিউ এ গিয়ে বাদ পরে যায়। অন্যদিকে অনেকে কোনো রকম লিখত কিংবা প্রিলিমিনিরাতি পাশ করে নিজের স্মার্টনেসের জন্য উতরিয়ে যায় ইন্টারভিউ। পাঁকা হয়ে যায় চাকরি।

ইন্টারভিউ কারা নেয়

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ওই অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইন্টারভিউ নিয়ে থাকেন। অন্যদিকে বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিচালক, ট্রাস্টি বোর্ড, গভার্নিং বোর্ডের লোকজন সহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ লোকজন থাকেন। 

ইন্টারভিউতে কেমন প্রশ্ন করা হয়

ইন্টারভিউ এ প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্টতা নেই। চাকরির ভিন্নতার উপর নির্ভর করে প্রশ্ন ও প্রশ্ন সংখ্যা। তবে ইন্টারভিউতে বাংলা ও ইংলিশ উভয় ভাষাতেই প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। বাংলায় প্রশ্ন করলে চাকরি প্রত্যাশিকে বাংলায় আর ইংলিশে প্রশ্ন করলে ইংলিশে উত্তর করতে হবে।

ইন্টারভিউতে করণীয়

ইন্টারভিউতে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়। 

  • ইন্টারভিউয়ের ধরণঃ ইন্টারভিউ তিন ধরণের হয়ে থাকে।

1. ওয়ান টু ওয়ান ইন্টারভিউঃ এই ধরণের ইন্টারভিউ হলো খুব সাধারণ ইন্টারভিউ। এ ধরণের ইন্টারভিউতে যে ইন্টারভিউ দেবে সে এবং একজন প্রশ্ন কর্তা সাধারণত বস থাকেন। এটা খুবই সাধারণ একটা পদ্ধতি।

2. প্যানেল ইন্টারভিউঃ বর্তমান সময়ে এ ধরণের ইন্টারভিউ এর জনপ্রিয়তা বেশি। এ ধরণের ইন্টারভিউ এ দুই বা তার অধিক মানুষ থাকেন প্রশ্নকর্তা হিসেবে। 

3. প্রতিযোগিতা ইন্টারভিউঃ এ ধরণের ইন্টারভিউকে বলা হয় প্রতিযোগিতা ইন্টারভিউ। যখন পদ সংখ্যার থেকে কয়েক গুণ বেশি ক্লাইন্ট ইন্টারভিউ দিতে আসে তখন বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। বিশেষ করে প্রাইভেট অর্থাৎ বেসরকারি চাকরি গুলো কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি গুলোতে এ ধরণের ইন্টারভিউ নেয়া হয়। 

4. ইন্টারভিউ এর পোশাকঃ ইন্টারভিউ এর জন্য পোশাক ও লুক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রবাদ আছে আগে দর্শনধারী পরে গুণ বিচারী। ছেলেদের ক্ষেত্রে ইন্টারভিউ এর সময় ক্লিন সেভ এর কোনো বিকল্প নেই। এবং পোশাকের দিকে মার্জিত ও ফরমাল পোশাক পড়তে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ফরমাল পোশাক পড়া প্রযোজ্য।

 

  • ভাষার ব্যবহারঃ ইন্টারভিউ এ মার্জিত ভাষার ব্যবহারের বিকল্প নেই। আঞ্চলিকতা পরিহার করা অত্যন্ত জরুরী। সেই সাথে ইন্টারভিউতে স্পষ্টভাষী হওয়া বাঞ্ছনীয়।
  • প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণাঃ ইন্টারভিউতে কেমন প্রশ্ন করা হয় সে সমর্কে অভিজ্ঞদের থেকে ধারণা নিলে আত্মবিশ্বাস চলে আসে খুব সহজেই। তাছাড়া গুগোল, ইউটিউবে ভাইবার প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
  • প্রশ্নকর্তাকে প্রশ্ন করাঃ ইন্টারভিউ এর শেষ দিকে এসে প্রশ্নকর্তাকে উক্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রশ্ন করে নিজের জানার আগ্রহকে জানান দিতে পারেন। 
  • প্রয়োজনীয় কাগজ সাথে রাখাঃ ইন্টারভিউ এর সময় প্রয়োজনীয় সকল কাগজ সাথে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই সাথে যে সিভি চাকরীর আবেদনের সময় দেওয়া হয়েছে সেটার একটি কপি সাথে রাখাও প্রয়োজন।

 

চাকরির ইন্টারভিউ এর বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর

চাকরির ইন্টারভিউ এ চাকরির ধরণেরর উপর নির্ভর করে প্রশ্র করা হয়। সেসব প্রশ্ন ও উত্তর পাঠকের সুবিধার্থে তুলে ধরা হলো।

  • নিজের সম্পর্কে বলুন ;

ইন্টারভিউতে সবচেয়ে কমন প্রশ্ন এটি। যে কোনো চাকরির ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নটা সচারচার করা হয়ে থাকে। মূলত কথা শুরুর জন্য এবং ইন্টারভিউদাতার স্মার্টনেস যাচাই করা হয় এই প্রশ্নের মাধ্যমে।

নিজের সম্পর্কে বলতে বলায় অনেকেই নিজের নাম, ঠিকানা, বাবা-মায়ের নাম বলতে শুরু করে। যা এক রকম ভুল। এসময় সিভির বাহিরের বিষয়াদি সম্পর্কে বলতে হয়। কেননা ইতোমধ্যে তারা আপনার সিভি দেখে নিয়েছেন। 

এই প্রশ্নের উত্তরে নিজের বিভিন্ন দক্ষতা সম্পর্কে জানান দেওয়া যেতে পারে। একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যেন উত্তর প্রফেশনাল লাইফ রিলেটেড হয় এবং দু’মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। কারণ ইন্টারভিউতে কম কথায় বেশি উত্তর দিতে পারাও একটি স্মার্টনেস।

  • আপনার দূর্বলতা কী?

এই প্রশ্নটি কম বেশি প্রতিটি চাকরির ইন্টারভিউ এর সময় করা হয়। ইন্টারভিউদাতাকে বুদ্ধিমত্তার সাথে পজিটিভলি প্রশ্নটির উত্তর করতে হবে যাতে সন্তুষ্ট হয় প্রশ্নকর্তা।

এই প্রশ্নে ব্যক্তিত্ব ভিত্তিক দূর্বলতা প্রকাশ করা সবচেয়ে বোকামি। এক্ষেত্রে প্রকাশ করতে হবে দক্ষতা ভিত্তিক দূর্বলতা এবং তা পজিটিভলি।

যেমনঃ আপনি কোনো কাজে অপারগ থাকলে তা উল্লেখ না করে বরং বলতে পারেন যে আপনি কোনো কাজ শুরু করলে তা শেষ না করে উঠতে পারেন না। কিংবা এমনটাও বলা যাবে না যে আপনি সবার সাথে সহজে মিশতে পারেন না, সেখানে বলতে পারেন খুব অল্প সময়ে মানুষের সাথে মিশে যাওয়াকে আপনি আপনার দূর্বলতা হিসেবে দেখেন। 

  • কেন আপনাকে নিয়োগ দেবো?

বিশেষ করে বেসরকারি কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি গুলোতে এই প্রশ্নটি করে থাকে। প্রশ্নটি দ্বারা প্রশ্নকর্তা জানতে চাচ্ছে উক্ত পোস্টে আপনি নিয়োগ পেয়ে কতোটা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকা রাখবেন।

এই প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রেও চৌকস হতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতে হবে। আপনি যে পদের জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন সে পোস্ট সম্পর্কে বিষদ জানা শোনা থাকা জরুরী। 

এই প্রশ্নের উত্তরে কখনোই বলা যাবে না ‘আমি জানি না কেন নিয়োগ দেবেন আমাকে ‘ আপনার এমন উত্তর আপনাকে নিয়োগ না দেওয়ার বড় কারণ হতে পারে। 

  • আগামী ৫ বছর পর আপনি আপনাকে কোথায় দেখতে চান?

ইন্টারভিউতে  এটিও একটি কমন প্রশ্ন। এই প্রশ্নেও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়। কোনো কম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে বলা যাবে না যে আগামী ৫ বছর পর নিজেকে কোম্পানির সিইও হিসেবে দেখতে চান।

বিচক্ষণতার সাথে বলা যেতে পারে যে আগামী ৫ বছরে আপনার দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আপনি প্রতিষ্ঠানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। 

এই প্রশ্নের উত্তর বাস্তববাদী হয়ে দিদে হবে। নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে উচ্চাকাঙ্খী হিসেবে। 

  • আপনার সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?

এই প্রশ্নের দ্বারা প্রশ্নকর্তা ইন্টারভিউদাতার পেশাদার কর্সক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে চান। 

এই প্রশ্নের উত্তরে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনকে দূরে সরিয়ে বিচক্ষণতার সাথে কর্মদক্ষতা কিংবা নেতৃত্ব সম্পর্কে জানান দিতে হবে।

  • আগের চাকরি কেন ছাড়তে চাইছেন কিংবা ছেড়েছেন?

ইন্টারভিউ এর ক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তা ইন্টারভিউদাতার সিভি দেখে এই প্রশ্নটি করে থাকে যদি সে অন্য কোথাও যুক্ত থেকে থাতে কিংবা ছেড়ে আসে এই ক্ষেত্রে।

এই প্রশ্নের উত্তরে কখনোই ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলেও তা সামনে আনা যাবে না। আগের চাকরির চেয়ে এই চাকরির পোস্ট এমনটা বলা যেতে পারে কেননা প্রত্যেকেই নিজেকে উচ্চ আসনে দেখতে চায়। 

  • ওভারটাইম কাজের ক্ষেত্রে আপনার মনোভাব সম্পর্কে জানতে চাই।

সরকারি কিংবা বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই ওভারটাইম কাজ করতে হয়। ওভারটাইম বলতে নির্ধারিত সময়ের বাহিরে অতিরিক্ত কাজ করা। 

ওভারটাইম সংক্রান্ত এই প্রশ্নের উত্তরেও দিতে হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। ওভারটাইম করতে পছন্দ না করলেও ওই সময়টায় সেটা বলা যাবেনা কারণ এতে করে আপনার চাকরি না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এ ক্ষেত্রে ইন্টারভিউদাতা বলতে পারেন যে, “আমি সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করি এবং কোনো কাজ সম্পন্ন না করে বিরতি নিয়েও শান্তি পাই না। তাই ওভারটাইম নিঢে কোনো সমস্যা নেই। “

  • আপনি কত বেতন প্রত্যাশা করেন?

ইন্টারভিউ বোর্ডে এই প্রশ্নটাও করা হয়ে থাকে। এই প্রশ্নের উত্তর মনগড়া দেয়ার সুযোগ নেই। তাই যে পোস্টে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ এ গেছেন সেই পোস্টের খুটিনাটি জানার সাথে বেতন সম্পর্কেও ধারণা রাখা দরকার।

  • কাজের চাপ কিভাবে সামলাবেন?

চাকরি করতে গেলে কাজের চাপ থাকবেই আর সেই চাপটিকেও সামলাতে হবে নিজের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। সেক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে উত্তর করতে হবে প্রশ্নটির।

  • আপনার আগের কাজ সম্পর্কে বলুন ;

আপনি অন্য কোনো চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে আসেন সেক্ষেত্রে এই প্রশ্নটির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি ।

এক্ষেত্রে আপনার আগের অফিসের বড় কোনো প্রজেক্টের খুঁটি নাটি সম্পর্কে বলতে হবে। নিজের কোনো প্রজেক্ট না থাকলেও অফিসের যে কোনো বড় প্রজেক্ট সম্পর্কে বলতে হবে। কোনো প্রজেক্ট সম্পন্ন করেননি এমনটা বলা যাবেনা। 

  • গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কতোটা বিচক্ষণ আপনি?

এই প্রশ্নটা প্রায়ই করা হয়ে থাকে কারণ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সম্মুখীন হতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের উপর আছে কোম্পানির লাভ-ক্ষতির বিষয়। এই ব্যাপারটি মাথায় রেখে উত্তর দিতে হবে।

এক্ষেত্রে বিচক্ষণতার সাথে উত্তর দিতে হবে ইন্টারভিউদাতাকে। প্রতিষ্ঠানের ভালো মন্দ দিক বিচার করে, কলিগদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেকে পারে। 

  • আপনার কোনো প্রশ্ন আছে কি?

সচারচার ইন্টারভিউ এর শেষ প্রশ্ন এটি হয়ে থাকে। এই প্রশ্নের উত্তর কখনোই না দেওয়া যাবে না। প্রতিষ্ঠান এবং আপনার পোস্ট সম্পর্কে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে এতে করে আপনার জানার আগ্রহ সম্পর্কে তারা অবগত হবে যা আপনার জন্য একটি পজিটিভ সাইন। 

পরিশেষ

প্রত্যেকেই নিজেকে বড় অবস্থানে দেখতে চায়। চাকরির ক্ষেত্রে নিজোকো বড় অবম্থানে দেখতে চাইলে আগে থেকেই চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার বিকল্প নেই। সেই সাথে ইন্টারভিউ এ কেমন প্রশ্ন হতে পারে তা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে কারণ শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেই হবেনা, ইন্টারভিউ এ প্রমাণ মেলে স্মার্টনেস এর। তাই ইন্টারভিউ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে হবে।

 নতুন নতুন প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট পড়তে চোখ রাখুন আমাদের ওয়েব সাইটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button